ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক হিসেবে উপস্থাপন এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রে লবিস্ট নিয়োগ করেছিল বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ। তবে কোটি টাকার সেই লবিং চুক্তি কার্যকর হওয়ার মাত্র ৩৭ দিনের মাথায় বাতিল হয়ে যায়।
যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের ফরেন এজেন্টস রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্ট (এফএআরএ) ইউনিটে জমা দেওয়া নথি অনুযায়ী, নিউইয়র্কভিত্তিক গ্লোবাল এআই করপোরেশন গত বছরের ২৫ আগস্ট প্রভাবশালী মার্কিন লবিং প্রতিষ্ঠান ব্রাউনস্টেইন হায়াত ফারবার শ্রেকের সঙ্গে ছয় মাস মেয়াদি একটি চুক্তি করে।
চুক্তি অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটিকে প্রতি মাসে ৪৫ হাজার ডলার বা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৫৫ লাখ টাকা পরিশোধের কথা ছিল। সেই হিসাবে ছয় মাসে মোট ব্যয় হওয়ার কথা ছিল প্রায় ২ লাখ ৭০ হাজার ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৩ কোটি ৩৩ লাখ টাকার বেশি।
এফএআরএতে জমা দেওয়া নথিতে বলা হয়, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, আইনের শাসন, মানবাধিকার, দুর্নীতি এবং একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে যোগাযোগ স্থাপনই ছিল এই লবিং কার্যক্রমের মূল উদ্দেশ্য।
নথিতে আরও উল্লেখ করা হয়, আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমন্বয় করে গ্লোবাল এআই করপোরেশন এমন তথ্য ও বিশ্লেষণ সরবরাহ করবে, যা অর্থনৈতিক, সামাজিক, পরিবেশগত ও প্রাতিষ্ঠানিক নীতি নির্ধারণে প্রভাব ফেলতে পারে।
লবিং কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ব্রাউনস্টেইন চারজন কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেয়। তারা হলেন পলিসি ডিরেক্টর সামান্থা কার্ল-ইয়োডার, সাবেক কংগ্রেসম্যান এডওয়ার্ড রয়েস, সিনিয়র পলিসি অ্যাডভাইজার লরেন ডিকম্যান এবং থমাস এন. ওটকা। তবে ২০২৫ সালের ১ অক্টোবর চুক্তি বাতিল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদেরও কার্যক্রম থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়।
গত ৩০ মার্চ জমা দেওয়া সাপ্লিমেন্টাল স্টেটমেন্টে ব্রাউনস্টেইন জানায়, গ্লোবাল এআই করপোরেশনের সঙ্গে তাদের চুক্তি ১ অক্টোবর শেষ হয়ে গেছে। আর্থিক হিসাব অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি মাত্র একবার ৭ হাজার ৫০০ ডলার পেয়েছিল। কেন চুক্তিটি বাতিল করা হয়েছে, তার ব্যাখ্যায় নথিতে শুধু লেখা হয়— “Client Terminated”।
চুক্তি বাতিলের কারণ জানতে গ্লোবাল এআই করপোরেশন ও ব্রাউনস্টেইন হায়াত ফারবার শ্রেকের কাছে ই-মেইল পাঠানো হলেও তারা কোনো জবাব দেয়নি।
এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ এ আরাফাত বলেন, তিনি এ ধরনের কোনো চুক্তির বিষয়ে অবগত নন। দলের সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল বলেন, বিদেশে অবস্থানরত কোনো শুভাকাঙ্ক্ষী হয়তো এমন উদ্যোগ নিয়ে থাকতে পারেন। বিষয়টি সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার পর চুক্তি বাতিল করা হয়ে থাকতে পারে।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর আওয়ামী লীগের পক্ষে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে লবিং কার্যক্রমের আরও উদ্যোগ দেখা যায়। একই বছরের ২ সেপ্টেম্বর শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের মালিকানাধীন ওয়াজেদ ইনকরপোরেটেড যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক স্ট্রাইক গ্লোবাল ডিপ্লোমেসিকে নিয়োগ দেয়। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান ক্রিশ্চিয়ান বোর্জ ও রবার্ট স্ট্রাইকের সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
বর্তমানে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার কার্যক্রম চলমান রয়েছে। বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত দলটির রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ রয়েছে। গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ নেয়নি। নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে বিএনপি সরকার গঠন করে এবং আওয়ামী লীগের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখে।
